হাঁপানি কী,কেন হয়,রোগ নির্ণয় এবং এর চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিন

অ্যাজমা বা হাঁপানি কী?

অ্যাজমা বা হাঁপানি হলো শ্বাসনালির প্রদাহজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এই প্রদাহের ফলে শ্বাসনালি ফুলে যায় এবং অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এতে হাঁপানির বিভিন্ন উপসর্গ, যেমন—কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ লাগা এবং শোঁ শোঁ আওয়াজ হয়। সঠিক ও নিয়মিত চিকিৎসার ফলে এ উপসর্গগুলোর সবই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। হাঁপানির চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহূত হয়, যেমন—রোগ উপশমকারী ওষুধ, রোগ প্রতিরোধ বা বাধাদানকারী ওষুধ। এ ওষুধগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে—কীভাবে কাজ করে, এগুলোর সঠিক মাত্রা কী, এগুলোর সাধারণত কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং কোন কোন ওষুধ ব্যবহার করা যাবে।

%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%bf

হাঁপানি কী,কেন হয়,রোগ নির্ণয় এবং এর চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নিন

 

হাঁপানি কেন হয়ঃ-

হাঁপানি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে এটি সংক্রামক বা ছোঁয়াচে নয়। প্রদাহজনিত কারণে শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। ফলে ঘন ঘন কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, আওয়াজ, বুকে চাপ বা দম নিতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদি সঠিকভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেওয়া হয়, তাহলে এ রোগে অনেক সময় মৃত্যুও হতে পারে। হাঁপানির সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। এ রোগের জন্য কোনো কিছুকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, কারও কারও বংশগত কারণে বা পরিবেশগত কারণেও এ রোগ হতে পারে। কারও নিকটাত্মীয় যদি এতে আক্রান্ত থাকে বা কেউ যদি বিভিন্ন দ্রব্যের প্রতি অতিমাত্রায় অ্যালার্জিক হয়, তাহলে তার হাঁপানি হতে পারে। এ ছাড়া শ্বাসনালি যদি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়, তাহলে এ রোগ হতে পারে।
এ ছাড়া ধুলোবালির মধ্যে থাকা মাইট নামের ক্ষুদ্র কীট, ফুলের পরাগরেণু থেকে; পশুপাখির পালক, ছত্রাক, মল্ট, ইস্ট, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে যারা থাকে তাদের এ রোগ হতে পারে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপান শুধু শ্বাসকষ্টের কারণই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটা হাঁপানির তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। হাঁপানির ওষুধের কার্যকরতা কমিয়ে দেয়, কখনো কখনো ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্ষমতাও কমে যায়।

কখনো কখনো ব্যক্তির পেশাগত কারণেও এ রোগটি হতে পারে। কিছু উত্তেজক উপাদান অনেক সময় সংবেদনশীল রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু করতে পারে—যেমন শ্বাসনালির সংক্রমণ, অ্যালার্জি-জাতীয় বস্তুর সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ, সিগারেটের ধোঁয়ার কারণেও এটি হতে পারে। কোনো কোনো ওষুধ, যেমন বিটা ব্লকার, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহূত হয়, এনএসএআইডি (ব্যথা নিরাময়কারী ওষুধ) এসপিরিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাঁপানির কারণ হতে পারে। এ ছাড়া মানসিক চাপে থাকলে হাঁপানির তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। কোনো কোনো খাবারের প্রতি সংবেদনশীল বা চিংড়ি মাছ, হাঁসের ডিম, গরুর মাংস, বেগুন, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, ইলিশ মাছ প্রভৃতি খেলে চুলকায়, নাক দিয়ে পানি পড়ে কারও কারও—অর্থাৎ অ্যালার্জি হয়। তবে খাবারের মাধ্যমে যে অ্যালার্জি হয় তাতে খুব কম লোকের অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কারও কারও বিভিন্ন সুগন্ধি, মশার কয়েল বা কারও কারও কীটনাশকের গন্ধ থেকেও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে।

পড়ুন  ত্বক এর চরম রুক্ষতায় পরম বন্ধু!

রোগ নির্ণয়ঃ-

হাঁপানি নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হচ্ছে রোগীর মুখে রোগের বিস্তারিত ইতিহাস জানা। হাঁপানির প্রধান উপসর্গগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকের মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া, বুকে চাপ অনুভব করা বা অল্পতেই দম ফুরিয়ে যাওয়া। তবে কখনো কখনো দুবার অ্যাটাকের মধ্যে রোগীর হাঁপানির কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। অল্প যেকোনো একটি বা এরও বেশি উপসর্গ থাকতে পারে।

সাধারণত এ উপসর্গগুলো রাতে বা খুব সকালে বেশি হয় এবং শ্বাসনালিতে কোনো ধরনের অ্যালজেন প্রবাহ প্রবেশ করলে বা অল্প মাত্রায় পরিবর্তিত হলে এ উপসর্গের তীব্রতা বেড়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরুর আগে নাক চুলকায়, হাঁচি হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, চোখ লাল হয়ে যায়। ওপরের উপসর্গগুলোর সঙ্গে বংশে কারও যদি হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় তার হাঁপানি রয়েছে।

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ করা যায়ঃ-

Loading...

গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অ্যাগেইনস্ট অ্যাজমা—সংক্ষেপে জিআইএনএ একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন, যারা অ্যাজমা নিয়ে কাজ করে থাকে। তাদের উদ্যোগে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ২০০৩ সাল থেকে সাধারণ মানুষ ও অ্যাজমা রোগীদের মধ্যে এ রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর মে মাসের প্রথম মঙ্গলবার বিশ্ব অ্যাজমা দিবস পালন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশে যেসব সংগঠন অ্যাজমা রোগীদের নিয়ে কাজ করে, যেমন—বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন, অ্যাজমা অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব একসেন এ দিনটি বিশেষ মর্যাদায় পালন করে থাকে। এদিন অ্যাজমা সম্পর্কে মানুষকে সচেতনতার লক্ষ্যে শোভাযাত্রা, পোস্টার প্রদর্শন, সেমিনার, অ্যাজমা রোগীদের সঙ্গে মতবিনিময়, অ্যাজমা রোগের সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন এবং অ্যাজমা রোগ প্রতিরোধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা হয়। এবার বিশ্ব হাঁপানি দিবসের স্লোগান হলো—‘নিজের হাঁপানি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন’। অর্থাৎ একজন রোগীর পক্ষে তার হাঁপানির উপসর্গগুলো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আর এটি তখনই সম্ভব, যখন একজন রোগীর তার রোগ, ওষুধ, উত্তেজক, ওষুধ ব্যবহারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং এ রোগের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকবে।

পড়ুন  হাঁপানি থাকলে কী খাবেন ও কী খাবেন না জেনে নিন

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রোগীর ভূমিকাঃ-

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রোগীর নিজের ভূমিকা অনেক। রোগীকে জানতে হবে, তার রোগটির প্রকৃতি কী, এর চিকিৎসা কী, তিনি ইনহেলার ব্যবহার করবেন কি না, ইনহেলারের কাজ কী প্রভৃতি। গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার করতে জানা। রোগীকে জানতে হবে কী চিকিৎসা তার প্রয়োজন, তার হাঁপানির উপসর্গ কখন বাড়ে, কখন ইনহেলার ব্যবহার করবে, কখন রোগটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং কখন রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে। যেহেতু হাঁপানি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, তাই এ রোগের ওষুধগুলো দীর্ঘমেয়াদি অবিরামভাবে ব্যবহার করতে হয়। কখনোই উপসর্গ কমে গেলে বা না থাকলে ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, অ্যাজমায় চিকিৎসা কদাচিৎই স্বল্পমেয়াদি হয়। এর মানে এও নয় যে একজন হাঁপানি রোগী সারা জীবনই এর জন্য ওষুধ নেবে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন অ্যাজমা রোগী যদি নিয়মিতভাবে হাঁপানি প্রতিরোধক ওষুধ নিয়মিত তিন থেকে পাঁচ বছর ব্যবহার করে, তাহলে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে এ রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ওষুধের মাত্রা সাধারণত উপসর্গের তীব্রতা অনুযায়ী নির্ণয় হয়ে থাকে, অর্থাৎ রোগের উপসর্গ কমে গেলে ধীরে ধীরে ওষুধের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হয়। কখনোই হঠাৎ করে কমানো উচিত নয়। রোগীকে জানতে হবে, কখন সে ওষুধের পরিমাণ বাড়াবে, কী কী উপসর্গ দেখলে সে তার চিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণের জন্য রোগীকে অবশ্যই বিভিন্ন ওষুধ দেওয়ার যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। অর্থাৎ সঠিকভাবে ইনহেলার নেওয়ার পদ্ধতি জানতে হবে। সঠিকভাবে নেবুলাইজার ব্যবহার জানা দরকার। এ যন্ত্রগুলো কীভাবে কাজ করে, সেটিও জানা দরকার। নিয়মিত সঠিক ওষুধ ব্যবহার ছাড়াও হাঁপানির উত্তেজক থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। রোগীকে জানতে হবে, তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো উত্তেজক আছে কি না। এ ছাড়া সাধারণ উত্তেজককে অবশ্যই পরিহার করতে হবে, যেমন—প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। বাসায় কার্পেট, যা রাখা বিশেষ করে শোয়ার ঘরে। বাসার মধ্যে কোনো পোষা জীব, যেমন—কুকুর, বিড়াল, পাখি না রাখা। বাসায় কোনো কীটনাশক স্প্রে ব্যবহার না করা, কখনোই ভেকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার না করা। দেখা গেছে, অ্যাজমা সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা পাওয়ার পর ৭৫ শতাংশ রোগীই হঠাৎ অ্যাজমার আক্রমণ থেকে বেঁচে যায় এবং ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না।

পড়ুন  দাগ দূর করার প্রাকৃতিক উপায়

চিকিৎসাঃ-

হাঁপানি সম্পূর্ণ ভালো করার জন্য এখনো কোনো ওষুধ বের হয়নি। তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। হাঁপানি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী পুরো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত হাঁপানি হার্ট অ্যাটাকের মতোই ভয়াবহ। এতে মৃত্যুও হতে পারে। হাপানি নিয়ন্ত্রণের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সতর্কভাবে খেয়াল রাখা, কোন কোন উপসর্গে রোগীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তা নির্ণয় করা এবং তা থেকে দূরে থাকা। কারণ সব হাঁপানি রোগীর রোগের উপসর্গ কমা বা বাড়ার জন্য একই উত্তেজক দায়ী নয়। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপরও আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। হাঁপানির ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।

Loading...

ফেসবুক কমেন্ট

comments

About ফারজানা হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.