শৈশবের স্মৃতি : সাঁতার

শৈশবের স্মৃতি মনে রাখাটা খুব কঠিন কাজ। তবু ওই বয়সের একটি স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আবছা আবছা নয়, যেন এখনো জীবন্ত আমার চোখে ভাসে।তখন আমাকে স্কুলে দেওয়া হয়েছে। রোদতপ্ত দুপুরে কাঁধ থেকে স্কুলব্যাগটা ধপাস করে ফেলে দিয়ে যখন ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিতাম। বাবা বাইরে থেকে ভরাট গলায় ডাকতেন। বাবার সেই শাসনবিজড়িত গলাটাতে যেন নিত্যকালের ভয় জড়ানো থাকত বলে একদৌড়ে হুড়মুড় করে এসে তাঁর সামনে হাজির হতে বিলম্ব করতাম না। বাবা তখন একরোখা স্বরে আদেশ করতেন ‘পুকুরে ঝাঁপ দাও।’আমি পুকুরে ঝাঁপ দিতাম। শানবাঁধানো ঘাটের সিঁড়ির আশপাশে পায়চারি করতে করতে বাবাও পানিতে নেমে আসতেন। আমাকে সাঁতার শেখাবেন বলে।

সাঁতারশৈশবের স্মৃতি : সাঁতার

এভাবে রোজ স্কুল থেকে ফিরলে বাবার আদেশে আমাকে পুকুরে ঝাঁপ দিতে হতো। বাবাও আমাকে সাঁতার শেখাবেন বলে দুনিয়ার সব কাজ রেখে পুকুরে নেমে আসতেন। ভাবখানা এমন, যেন ছেলেকে সাঁতার ভালো শিখতেই হবে এবং সেটা খুব শিগগির। দেরি করা যাবে না।
দেরি করতেও হয়নি। সাত দিনের মাথায় আমি সাঁতারে পারদর্শী হলাম। সেটা কেবল বাবার দৃঢ় প্রচেষ্টায়।
একদিন সাঁতারকাটতে কাটতে যখন মাঝ পুকুরে চলে গেছি, দেখি বাবা পুকুর পাড়ে মরা নারকেলগাছটি ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছেন। কাঁদছেন তো কাঁদছেনই। ঘটনা কী…!
আমি পুকুরঘাটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখি বাবা চোখ থেকে উপচে পড়া পানি মুছতে মুছতে ঘরে চলে গেলেন।
পরে মায়ের কাছে বাবার সেই রহস্যময় কান্নার গল্প শুনলাম। আমার জন্মের আগে সুপন নামে আমার যে ১০ বছরের ভাইটি ছিল, সে মারা গেছে কোনো এক চৈত্রের দুপুরে পুকুরে ডুবে। সাঁতার জানা ছিল না বলে পানি থেকে রক্ষা পায়নি আমাদের পরিবারের বড় সন্তানটি।
জন্ম হলো আমার। শুনেছি আমি নাকি হাঁটতে শেখার আগেই বাবা চেয়েছেন সাঁতার যেন আগেই শিখি। যেন তাঁর এই ছেলেও বড় সন্তানের মতো কোনো এক চৈত্রের দুপুরে পুকুরে না ডুবে মরে। মা আমাকে বাবার সাঁতার শেখানোর রহস্য বলছেন আর মায়ের চোখও ভরে উঠছিল পানিতে।

ফেসবুক কমেন্ট

comments

About ফারজানা হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *