হৃৎপিণ্ডের গঠন বিন্যাস সম্পর্কিত তথ্য

‌হৃৎপিন্ড একটি পেশীবহুল অঙ্গ। এটি পৌনপৌনিক ছান্দিক সংকোচনের মাধ্যমে রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্ত সারা দেহে প্রবাহিত করে। এনালাইড, মলাস্কা এবং আর্থোপোডাতেও অনুরূপ অঙ্গ বিদ্যমান।

হৃৎপিণ্ডের

হৃৎপিন্ড ও ফুসফুস

কার্ডিয়াক প্রতিশব্দটির (কার্ডিওলোজি পরিভাষায়) অর্থ “হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত” যা গ্রীক (καρδία), কার্ডিয়া হতে এসেছে। হৃৎপিন্ড এক ধরনের মসৃণ পেশী – হৃৎপেশী দ্বারা গঠিত, যা কেবলমাত্র এই অঙ্গেই পাওয়া যায়। গড়পড়তায় একটি মানব হৃৎপিন্ড প্রতি মিনিটে ৭২ বার স্পন্দিত হয়, সে হিসাবে ৬৬ বছরের জীবনে এটি প্রায় ২.৫ বিলিয়ন বার স্পন্দিত হয়।

 

হৃৎপিণ্ডের গর্ভস্থ বিকাশ

গর্ভধারণের ২১ দিন পরে, মানব হৃৎপিন্ড প্রতি মিনিটে ৭০ থেকে ৮০ বার স্পন্দিত হওয়া শুরু করে এবং প্রথম মাসে স্পন্ধন রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ভ্রুণাবস্থার প্রথম ২১ দিন কার্যকর হৃৎপিন্ড না থাকলেও কিভাবে রক্ত পরিবাহিত হয় তা অজানা, যদিও কেউ কেউ প্রস্তাব করেন যে, হৃৎপিন্ড প্রকৃত পক্ষে হাইড্রলিক র‌্যামের মত কোন পাম্প নয়- বরং চারপাশের ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তার ফলে সৃষ্ট একটি অঙ্গ।

হৃৎপিণ্ডগর্ভধারণের ২১ দিন পরে, মানব হৃৎপিন্ড প্রতি মিনিটে ৭০ থেকে ৮০ বার স্পন্দিত হওয়া শুরু করে এবং প্রথম মাসে স্পন্ধন রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে

মানব ভ্রুণীয় (embryonic) হৃৎপিন্ড স্পন্দন শুরু করে– গর্ভধারণের প্রায় ২১ দিন পরে, আথবা সর্বশেষ স্বাভাবিক ঋতুস্রাবের (menestrual period) পাঁচ সপ্তাহ পরে (LMP), যা সাধারণত গর্ভধারণের সময় কাল নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়। মানব হৃৎপিন্ড মায়ের হৃৎ-স্পন্দন হারের কাছাকাছি হারে প্রথমে স্পন্দিত হতে থাকে, যা প্রায় ৭৫-৮০ স্পন্দন/মিনিট (BPM)।

 

ভ্রুনীয় স্পন্দন হার (EHR) প্রথম মাসে রৈখিকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা ৭ম সপ্তাহের শুরুতে (অর্থাৎ LMP-র পরে ৯ম সপ্তাহের শুরুতে) ১৬৫-১৮৫ BMP-তে পৌছায়। এই বৃদ্ধির হার প্রতি দিন প্রায় ৩.৩ BMP বা প্রতি তিন দিনে ১০ BMP, যা প্রথম মাসে ১০০ BMP পর্যন্ত বাড়ে।

 

LMP-র পরে ৯.২ সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবার পর, এই হার কমতে শুরু করে যা ১৫ সপ্তাহে প্রায় ১৫২ BMP (+/-২৫ BMP) -তে নেমে আসে। ১৫ সপ্তাহ পরে এই ক্রমহ্রাসের হর কমতে থাকে এবং গর্ভকাল শেষে গড়ে ১৪৫ BMP (+/-২৫BMP)-তে দাঁড়ায়। ভ্রুণ ২৫ মিমি দৈর্ঘ্যে পৌছানোর আগে বা ৯.২ LMP সপ্তাহে ক্রমহ্রাস সূত্রকে প্রকাশ করা হয় এভাবে- বয়স (দিন হিসেবে)= ভ্রুণীয় স্পন্দন হার(০.৩)+৬। (Age in days=HER(0.3)+6)

জন্মের আগে নারী ও পুরুষের হৃৎস্পন্দন হারে কোন পার্থক্য থাকে না।

হৃৎপিণ্ডের গঠন

প্রাণিকূলের শাখা ভেদে হৃৎপিন্ডের গঠনপ্রণালিতে পার্থক্য দেখা যায় ।
মানবদেহে হৃৎপিন্ড বক্ষগহ্বরের (Thorax) মাঝ বরাবর অবস্থিত যার একটি বড় অংশ কিছুটা বাম দিকে স্ফীত (যদিও কখনও কখনও তা ডান পাশেও হতে পারে, ডেক্সটোকার্ডিয়া দেখুন) এবং এটি ঠিক বুক্কাস্থির(Sternum) নিচে থাকে। (দেখুন ডায়াগ্রাম)। হৃৎপিন্ড সাধারণত বাম দিকে অনুভূত হয় কারণ বাম নিলয় (left ventricle) অন্যান্য প্রকোষ্ঠ হতে শক্তিশালী (এটি সারাদেহে রক্ত পাম্প করে পাঠায়)। বাম ফুসফুস ডান হতে আকারে ছোট কারণ হৃৎপিন্ড বাম হেমিথোরাক্সের বেশী জায়গা জুড়ে থাকে। হৃৎপিন্ড হৃদাবরণ (pericardium) দ্বারা আবৃত থাকে এবং ফুসফুস একে পরিবেষ্টন করে থাকে। হৃদাবরণ দুটি অংশ নিয়ে গঠিত:
১। ফাইব্রাস হৃদাবরণ, ঘণ যোযক কলা (dense connective tissue) দ্বারা তৈরী: এবং
২। সেরাস হৃদাবরণ, যা একটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট আবরণ এবং এর ভেতরে সেরাস রস থাকার কারণে হৃদ সংকোচনের সময় সৃষ্ট ঘর্ষণ কমায়।
হৃদ গহ্বরকে মেডিয়েসটিনাম বলে যা বক্ষ গহ্ববরের একটি অংশ।

 

মানব হৃৎপিন্ড ৪টি মূল প্রকোষ্ঠে বিভক্ত, ডান অলিন্দ ও ডান নিলয় এবং বাম অলিন্দ ও বাম নিলয় । অলিন্দদ্বয় আন্তঅলিন্দ দেয়াল এবং নিলয়দ্বয় আন্তনিলয় দেয়াল দ্বারা পৃথক থাকলেও ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে ট্রাইকাস্পিড কপাটিকা এবং বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝে বাইকাস্পিড কপাটিকার মাধ্যমে একমুখী সংযোগ বিদ্যমান ।

হৃৎপিন্ডের সর্ববামের নিম্নগামী ভোঁতা অংশকে এ্যাপেক্স বলে। হৃৎ স্পন্দন শোনার জন্য একটি স্টেথোস্কোপ সরাসরি এ্যাপেক্সের উপর স্থাপন করা যায়। এটি বাম মধ্য-ক্ল্যাভিকুলার রেখায় ৫ম ইন্টারকস্টাল স্থানের পেছনে অবস্থিত। স্বাভাবিক পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির হৃৎপিন্ডের ওজন ২৫০-৩৫০ গ্রাম (৯-১২ আউন্স)। কিন্তু একটি অসুস্থ হৃৎপিন্ড বিবৃদ্ধির (organ hypertrophy) কারণে ১০০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। এটি চারটি প্রকষ্ঠ নিয়ে গঠিত: উপরে দুটি অলিন্দ (atrium) এবং নিচে দুটি নিলয় (ventricle)। নিম্নের বামের ছবিটি ৬৪ বছর বয়স্ক পুরুষ হতে সদ্য বিচ্ছিন্নকৃত একটি হৃৎপিন্ডের।

 

মাছের হৃৎপিন্ড

প্রাগৈতিহাসিক মাছের হৃৎপিন্ড ৪প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট হলেও তা মেরুদন্ডী ও পাখিদের ৪প্রকোষ্ঠী হৃৎপিন্ডের মতো নয় কেননা প্রকোষ্ঠগুলো এক সারিতে সজ্জিত।

আধুনিক মাছের ৪প্রকোষ্ঠী হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠগুলো এক সারিতে সজ্জিত নয়, বরং S (ইংরেজি বর্ণ S) এর মতো সজ্জিত।

 

দ্বিপ্রবাহী হৃৎপিন্ড

উভচর এবং অধিকাংশ সরীসৃপের হৃৎপিন্ড দ্বিপ্রবাহী সংবহনতন্ত্রবিশিষ্টহলেও হৃৎপিন্ড পুরোপুরি দুই পাম্পে বিভক্ত নয়। এসব প্রাণিতে ফুসফুসের উপস্হিতির কারণে হৃৎপিন্ডের দ্বিবিভাজন ত্বরান্বিত হয়।

উভচর প্রাণিদের হৃৎপিন্ড দুইটি অলিন্দ আর একটি নিলয় নিয়ে গঠিত।

সরীসৃপদের হৃৎপিন্ড দুইটি অলিন্দ আর একটি অসম্পূর্ণভাবে বিভক্ত নিলয় নিয়ে গঠিত।

সম্পূর্ণ বিভাজিত হৃৎপিন্ড
পাখি এবং স্তন্যপায়ীদের হৃৎপিন্ড সম্পূর্ণভাবে ৪টি মূল প্রকোষ্ঠে বিভক্ত।

হৃৎপিণ্ডের

মানব হৃৎপিন্ড

হৃৎপিণ্ডের কার্যপদ্ধতি

হৃৎপিন্ডের ডান অংশের কাজ হল পুরো দেহ হতে ডান অলিন্দে অক্সিজেন-শূন্য রক্ত সংগ্রহ করা এবং ডান নিলয়ের মাধ্যমে তা পাম্প করে ফুসফুসে (পালমোনারী সংবহন) প্রেরণ করা, যাতে কার্বন ডাই-অক্সাইড রক্ত হতে নিষ্কাশিত এবং অক্সিজেন যুক্ত হতে পারে (বায়ু বিনিময়)। এই বায়ু আদান-প্রদান অক্রিয় ব্যাপনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। হৃৎপিন্ডের বাম অংশ অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত ফুসফুস হতে বাম অলিন্দে গ্রহণ করে। বাম অলিন্দ হতে রক্ত বাম নিলয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং সারা দেহে সঞ্চারিত হয়। দুই দিকেই, উপরের অলিন্দগুলো হতে নিচের নিলয়গুলোর দেয়াল পুরু ও শক্তিশালী। আবার ডান নিলয়ের দেয়াল হতে বাম নিলয়ের দেয়াল বেশী পুরু, কারণ সিস্টেমিক সংবহনে রক্ত সরবরাহ করতে আরও বেশী শক্তির প্রয়োজন হয়।

 

ডান অলিন্দ হতে রক্ত ট্রাইকাস্পিড কপাটিকার ভেতর দিয়ে ডান নিলয়ে প্রবেশ করে। এখান থেকে রক্ত ফুসফুসীয় সেমিলুনার কপাটিকার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে ফুসফুসীয ধমনী দিয়ে ফুসফুসে পৌছে। ফুসফুস হতে রক্ত ফুসফুসীয় শিরা দিয়ে বাম অলিন্দে যায়। সেখান থেকে রক্ত বাইকাস্পিড কপাটিকার ভেতর দিয়ে বাম নিলয়ে প্রবেশ করে। বাম নিলয় এই রক্তকে এ্যাওটিক সেমিলুনার ভাল্বের ভেতর দিয়ে এ্যাওর্টায় পাম্প করে পাঠায়। এ্যাওর্টা কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয় এবং এইসব প্রধান শাখা ধমনী দিয়ে রক্ত সারা দেহে সঞ্চালিত হয়। রক্ত ধমনী হতে তার চেয়ে সরু ছোট ধমনীতে (arterioles) প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যায়ে আরও ক্ষুদ্র কৈশিকনালীর মাধ্যমে কোষে পৌছায়। এরপরে অক্সিজেন-শূণ্য রক্ত ছোট শিরার (venules) ভেতর দিয়ে গিয়ে শিরায় পৌছায়। এইসব শিরা পরে সুপিরিয়র ও ইনফিরিয়র ভেনাকেভা তৈরি করে শেষ পর্যন্ত ডান অলিন্দে পৌছায় এবং আবার উপরোক্ত পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

 

হৃৎপিন্ড কার্যত একটি সিনশাইসিয়াম, অর্থাৎ হৃৎপেশীর একটি বুনানি যারা পরস্পর সাইটোপ্লাজমিয় সংযুক্তি দিয়ে সংযুক্ত। ফলে বৈদ্যুতিক সংকেত একটি কোষে পৌছালে তা দ্রুতগতিতে সকল কোষে পৌছে যায় একং পুরো হৃৎপিন্ড তখন একসাথে সংকুচিত হয়।

 

হৃৎপিণ্ডের প্রাথমিক চিকিৎসা

হৃৎপিন্ড সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা বিষয়ে দেখুন কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট

যদি কোন ব্যক্তির কার্ডিয়াক এ্যারেস্ট (হৃদ রোধ/হৃদ-স্পন্দন বন্ধ হওয়া)হয় তবে কার্ডিওপালমোনারী রিসাসিটেশন (CPR) শুরু করতে হবে। যদি একটি স্বয়ংক্রিয় এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর যন্ত্র পাওয়া যায় তবে এটি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিফিব্রিলেশনের কাজ করা যায়। সাধারণত পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসে একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সাহায্য করা উচিত।

হৃৎপিণ্ডের

হৃৎপিন্ড

অ্যাজটেক হৃৎপিন্ড উৎপাটন

আ্যাজটেক সভ্যতায় মানব বলিতে, হৃৎপিন্ড উৎসর্গীকৃত প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হত। পুরোহিত একটি পাথরের ছুরি দিয়ে বক্ষগহ্বর উন্মুক্ত করত এবং হৃৎপিন্ড বের করে নিয়ে আসতো। যা পরে দেবতার উদ্দেশ্যে পাথরের বেদিতে রাখা হতো। সবচেয়ে বৃহৎ উৎসর্গের ঘটনা সংঘটিত হয় মনটাজুমার আমলে, যেখানে প্রায় ১২,০০০ এর উপরে শত্রু সৈন্যদের হৃৎপিন্ড উৎপাটন করা হয়েছিল।

কিডনি নষ্টের ১০ টি প্রধান কারণ জেনে নিন

সূত্র:উইকিপিডিয়া

ফেসবুক কমেন্ট

comments

About সাদিয়া প্রভা

সাদিয়া প্রভা , ইন্ডিয়ার Apex Group of Institutions এর BBA এর ছাত্রী ছিলাম। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিয়সক তথ্য নিয়ে লেখালেখি করি।

One comment

  1. দুশ্চিন্তা থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *