এ সময়ে জ্বর হলে ঠিক কী করণীয়!!!

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে সারা দেশেই ভাইরাসজনিত জ্বর, সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা, চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গুর মতো জ্বর হচ্ছে। এ সময়ে জ্বর হলে ঠিক কী করণীয়—এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন আপনার ডক্টর।

জ্বর

এ সময়ে জ্বর হলে ঠিক কী করণীয়!!!

সর্দি-কাশি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা

হঠাৎ গরমজনিত সর্দি-কাশি হতে পারে। এ সময় গলাব্যথা, গলায় খুসখুস ভাব, নাক বন্ধ হওয়া, নাক দিয়ে অনবরত হাঁচি হয় বা পানি পড়ে। উপসর্গ হিসেবে মাথা ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করা, দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে। হালকা জ্বর পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে গেলেও কাশি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সাইনাস ও টনসিলের প্রদাহ বাড়ে, হয় অ্যালার্জিক রাইনাইটিসও। এ সময় অ্যাজমার রোগীদের শ্বাসকষ্টও বেড়ে যেতে পারে। নাকের ঘন সর্দি বা কাশির সঙ্গে হলুদাভ কফ ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকেই নির্দেশ করে।

করণীয় : এ সময় ঠাণ্ডা বা বাসি খাবার ও পানীয় পরিহার করা, ধুলাবালি এড়িয়ে চলাসহ ধূমপান পরিহার করা উচিত। এ সময় মাঝেমধ্যে হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা, ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস—বিশেষ করে চোখ বা নাক মোছার পরপরই হাত ধোয়া উচিত। শিশুদের বিশেষ সতর্কভাবে রাখতে হয়, তাদের বুকে যাতে কফ না বসে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফুসফুসে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ইত্যাদিও কিন্তু হতে পারে। ঘন ঘন আদা-চা বা লেবুর চা পান, তুলসীপাতা জ্বাল দিয়ে বা হালকা গরম পানিতে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে বেশ কাজ দেয়। তবে ভাইরাস জ্বরের সঙ্গে কাশি থাকলে সহজে ভালো হতে চায় না বা কয়েক সপ্তাহ লেগে থাকে। হাঁপানি, অ্যালার্জি বা সাইনোসাইটিস না থাকলেও এমনটি ঘটতে পারে। অনেক সময় এমনিতেই কাশি সেরে যায়। গলা ব্যথায় কুসুম কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ, প্রয়োজনে কাশির সিরাপ সেবন বা নাকের ড্রপ ব্যবহার করা যায়। অ্যাজমার রোগীরা ধুলাবালি বা ঠাণ্ডা এড়িয়ে চললে এবং অ্যালার্জির ওষুধ বা ইনহেলার ব্যবহার করলে ভালো থাকেন।

ডেঙ্গু

সাধারণত মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম ও বর্ষার সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর সময়টাই এখন। এই জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে হয়ে থাকে। জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে কয়েক দিনে সেই ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।

সাধারণ ডেঙ্গু ও হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণজনিত ডেঙ্গু—এই দুই ধরনের ডেঙ্গু রয়েছে। ডেঙ্গু হলে রক্তের প্ল্যাটিলেট কমে গিয়ে প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা, চোখ লাল হওয়া ও চোখ ব্যথা, চোখ থেকে পানি পড়া, অরুচি বা বমি বমি ভাব ইত্যাদি উপসর্গ থাকে। জ্বর চার-পাঁচ দিনের মধ্যে কমে গিয়ে গায়ে হামের মতো র‍্যাশ হতে পারে। একপর্যায়ে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু রক্তক্ষরণজনিত ডেঙ্গু বেশি মারাত্মক এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না নিলে তাতে রোগীর মৃত্যু ঘটে। এ ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে দাঁত ও মাড়ির গোড়া থেকে রক্ত পড়া, নাক দিয়ে বমির সঙ্গে রক্ত পড়া, গায়ে রক্ত জমে ছিঁটা ছিঁটা দাগ ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে রক্তপাত হতে পারে।

করণীয় : সাধারণ ডেঙ্গু অনেক ক্ষেত্রে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। বেশির ভাগ ডেঙ্গুই সাত দিনের মধ্যে সেরে যায় এবং তেমন ভয়াবহ নয়। এ সময় পরিপূর্ণ বিশ্রাম, যথেষ্ট পানি বা তরল খাবার গ্রহণ দরকার। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল গ্রুপের ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। তবে ব্যথানাশক অ্যাসপিরিন বা ক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে বারবার গা মোছাতে হবে। তবে জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা মাত্র হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে উন্নত চিকিৎসার জন্য।

চিকুনগুনিয়া

ডেঙ্গু নয়, তবে ডেঙ্গুর মতোই ভাইরাসজনিত অসুখ চিকুনগুনিয়া। ইদানীং চিকুনগুনিয়ার রোগী বেশ পাওয়া যাচ্ছে। এই জ্বরের লক্ষণ অনেকটা ডেঙ্গুর মতোই। এতে দেহের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে প্রায় ১০৪ ডিগ্রি বা আরো বেশি উঠে যায়। তবে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে না বা ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে না। জ্বরের সঙ্গে মাথা ব্যথা, চোখ জ্বালা, গায়ে লাল লাল দানার মতো র‍্যাশ, অবসাদ, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথার সঙ্গে তা ফুলেও যেতে পারে। এ ছাড়া এটি হাত, পা, গোড়ালি ও কবজির মারাত্মক ব্যথার জন্য দায়ী। মাথা ব্যথা, মাংসপেশির দুর্বলতা ও হাঁটতে অক্ষমতা দেখা যায়। চিকুনগুনিয়া সাধারণত দুই থেকে পাঁচ দিন থাকে এবং এরপর নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। তবে এর বিশেষ দিক হলো ডেঙ্গুতে যেমন প্ল্যাটিলেট কমে যায়, রক্তক্ষরণের ঝুঁকি এমনকি মৃত্যুঝুঁকি থাকে, চিকুনগুনিয়ায় এগুলো থাকে না।

করণীয় : চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচতে হলে মশার সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। অর্থাৎ কোনোভাবেই যেন মশা গায়ে কামড় না দেয় বা শরীরে না বসতে পারে সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণত এডিস মশার কামড়ে এ রোগ হয়। এই জ্বরের কোনো প্রতিষেধক বা টিকা নেই। প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ। এ মশা মূলত দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করা। এ জন্য রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি, ফলের জুস বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। জ্বর বেশি হলে পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। গলা ব্যথা থাকলে লবণ ও গরম পানি দিয়ে ঘন ঘন গার্গল করতে হবে। রোগীকে প্রচুর পানি খেতে হবে। এ ছাড়া ফলমূল ও সতেজ শাকসবজি খাওয়া উচিত।

টাইফয়েড

সালমোনেলা টাইফি ও সালমোনেলা প্যারাটাইফি জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে টাইফয়েড হয়। এটা সংক্রমিত (সংক্রমিত ব্যক্তির মল ও মূত্র দ্বারা) খাদ্য বা পানি পানের দ্ব্বারা ছড়ায়। প্রচণ্ড জ্বর (১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট), মাথা ব্যথা, দুর্বলতা, গল ব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, লিভার বা প্লিহা বড় হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এই রোগের লক্ষণ। শুরুর দিকে চাপা অস্বস্তি, মাথা ব্যথা, ঝিমঝিম করা, পুরো শরীর ব্যথা, ডায়রিয়া বা বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি হতে পারে।

পরামর্শ : টাইফয়েড প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এবং সঠিক চিকিৎসা করলে এর গুরুতর জটিলতা এড়ানো যায়। এ সময় রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে থেকে পর্যাপ্ত তরল, স্বাস্থ্যকর ও সুষম, উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন খাবার খেতে হবে। ফুটিয়ে, নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান, ভালোভাবে হাত ধোয়া, ঘরের জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহূত জিনিসপত্র আলাদা করে রাখা উচিত। চিকিত্সকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনসহ পানিশূন্যতা দেখা দিলে শিরার মাধ্যমে তরল দিতে হবে।

ম্যালেরিয়া

শক্তিশালী পরজীবী জীবাণুর কারণে সাধারণত ম্যালেরিয়া জ্বর হয়ে থাকে। এ রোগে উচ্চমাত্রায় জ্বর, বমি বমি ভাব ও মাথা ব্যথা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী এক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন ধরনের ম্যালেরিয়া রয়েছে। এর কোনো কোনোটি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়।

করণীয় : কারো ম্যালেরিয়া হয়েছে এমন সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। রোগটি কোন ধরনের ম্যালেরিয়া এ বিষয়টি নির্ণয় করলে রোগের চিকিৎসায় সুবিধা হয়।

জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়!

জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে—এ ধারণা ঠিক নয়। কী কারণে জ্বর হয়েছে, জ্বরের পেছনে কী ধরনের জীবাণু রয়েছে তার ওপরই নির্ভর করে জ্বরের চিকিৎসা। মনে রাখতে হবে, ভাইরাসজনিত জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই, তা এমনিতেই সেরে যায়। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত কারণে জ্বর হলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা দরকার। প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিকের কিন্তু নিজস্ব ধরন রয়েছে। তাই কোন জ্বরে কোন অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হবে—এটা নির্ণয় করতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা লাগে। তাই রোগ নির্ধারণ না করে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে একপর্যায়ে ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আর কাজ করে না। এতে শরীরের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়। তাই চিকিত্সকের বাইরে কারো পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন নয়। বরং সব চিকিৎসাই চিকিত্সকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত।

ফেসবুক কমেন্ট

comments

About পূর্ণিমা তরফদার

আমি পূর্ণিমা তরফদার আপনার ডক্টরের নতুন রাইটার। আশাকরি আপনার ডক্টরের নিয়ামিত পাঠকরা আমাকে সাদরে গ্রহণ করবেন ও আমার পোষ্টগুলো পড়বেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *