মাসিক ও ডিম্বাণু সম্পর্কে কিছু কথা

রজঃস্রাব (ইংরেজি: Menstruation) হলো উচ্চতর প্রাইমেট বর্গের স্তন্যপায়ী স্তরী- একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যা প্রজননের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতি মাসে এটি হয় বলে এটিকে বাংলায় সচরাচর মাসিক বলেও অভিহিত করা হয়। প্রজননের উদ্দেশ্যে নারীর ডিম্বাশয়ে ডিম্বস্ফোটন হয় এবং তা ফ্যালোপিয়ন টিউব দিয়ে জরায়ুতে চলে আসে এবং ৩-৪ দিন অবস্থান করে। মাসিক চলাকালে যদি পুরুষের সঙ্গে যৌনমিলনের মাধ্যমে নারীর জরায়ুতে শুক্র না-আসে এবং এই না-আসার কারণে যদি ডিম্ব নিষিক্ত না হয় তবে তা নষ্ট হয়ে যায় এবং জরায়ুগাত্রের অভ্যন্তরতম সরস স্তর(এন্ডমেট্রিয়াম) ভেঙ্গে পড়ে।

মাসিক

এই ভগ্ন ঝিল্লি, সঙ্গের শ্লেষ্মা ও এর রক্ত বাহ থেকে উৎপাদিত রক্তপাত সব মিশে তৈরী তরল এবং তার সংগে এর তঞ্চিত এবং অর্ধ-তঞ্চিত মিশ্রণ কয়েক দিন ধরে লাগাতার যোনিপথে নির্গত হয়। এই ক্ষরণই রজঃস্রাব বা রক্তস্রাব বা ঋতুস্রাব বা মাসিক। কখনো একে গর্ভস্রাব হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। যদি নারী জরায়ুতে অবমুক্ত ডিম্বটি পুরুষের স্খলিত শুক্র দ্বারা নিষিক্ত হয়ে এণ্ডোমেট্রিয়ামে প্রোথিত (ইম্প্ল্যান্টেশন) হয় তবে আর রজঃস্রাব হয় না। তাই মাসিক রজঃস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া নারীর গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্ত্রী-গ্রন্থিদ্বয় (ওভারি)

একটি মেয়ের জন্মের সময়ে তার দুটি স্ত্রী-গ্রন্থিতে প্রায় বিশ লক্ষ ক্ষুদ্র থলি বা ফলিকল থাকে। এই থলি ফাঁপা বলের মত কোষসমষ্টি এবং প্রত্যেকটির কেন্দ্রে একটি অপরিণত ডিম্বাণু থাকে (মাসিক চলাকলে পুরুষের সাথে নারীর মিলনে এই ডিম্বানুর সাথে শুক্রানুর মিলনে বাচ্চা হয়) । একটি মেয়ের শৈশবাবস্থায় স্ত্রী-গ্রন্থিদুটি প্রায় অর্ধেক সংখ্যক থলিগুলিকে আত্মভূত করে নেয়। ঋতুচক্র বা মাসিক শুরু হওয়ার সময়ে ও প্রজননক্ষম বয়সে স্ত্রী-গ্রন্থিদ্বয়ে অবস্থিত প্রায় চার লক্ষ থলি থেকে তিনশ থেকে পাঁচশয়ের কাছাকাছি পরিণত ডিম্বাণু তৈরী হয়।

পড়ুন  একজন কুমারী মেয়ের সাথে প্রথম যৌন সঙ্গম কিভাবে করব?

দীর্ঘকাল ধরে প্রজনন-বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে এসেছেন যে সব স্তন্যপায়ী স্ত্রীপ্রাণী জন্মের সময়েই যথেষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু-উত্পাদক থলি নিয়ে জন্মায় এবং জীবিতাবস্থায় তাদের শরীরে আর নতুন কোন ডিম্বাণু জন্মায় না। কিন্তু ইদানীং কালে নিরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে স্ত্রী-ইঁদুরের শরীরে এরকম বহু থলি মজুত থাকে এবং তার থেকে তাদের জীবদ্দশায় নতুন ডিম্বাণু জন্মায়। এটি মহিলাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কিনা সে বিষয়ে আরও সমীক্ষার প্রয়োজন আছে।

মাসিক কখন শুরু এবং কখন শেষ হয়? না জানলে জেনে নিন

মেয়েদের প্রজননক্ষম বয়সকালে, প্রত্যেক মাসে, শরীরে প্রবাহিত হর্মোনগুলির প্রভাবে দশ থেকে কুড়িটি থলি (ফলিকল) পরিণত হতে শুরু করে। সাধারণত, একটিমাত্র থলিই সম্পূর্ণরূপে পরিণত হয়। বাকিগুলি পরিণত হওয়ার আগেই আবার আমাদের শরীরে মিশে যায়। ঐ থলির মধ্যেকার কোন কোন কোষ থেকে এস্ট্রোজেন নামে হর্মোনের ক্ষরণ হয়। ডিম্বাণুসহ পরিণত থলিটি স্ত্রী-গ্রন্থির ওপরের দিকে উঠতে থাকে। ডিম্বাণু জন্মের সময়ে (ওভ্যুলেশন) থলি এবং স্ত্রীগ্রন্থির মুখ খুলে যায় ও ক্ষুদ্রকায় ডিম্বাণু ভেসে বেরিয়ে আসে। এই সময়ে অনেক মহিলা তাঁদের তলপেটের নীচের দিকে বা পিঠে ক্ষণস্থায়ী তীব্র যন্দ্রণা ও খিল ধরা ভাব অনুভব করেন। এর সঙ্গে জরায়ু-গ্রীবা (সারভিক্স) থেকে রসনিঃসৃত হয়, এবং তার সাথে কোন কোন সময়ে রক্তও থাকে। এই সময়ে কোন কোন মহিলার মাথা ধরে, পাকস্থলীতে (গ্যাসট্রিক) যন্ত্রণা হয়, শরীর ছেড়ে দেয়, ও আলস্য বোধ হয়। আবার কেউ কেউ এই সময়ে খুবই সুস্থ বোধ করেন।

পড়ুন  বাচ্চা প্রসবকালে মা এর যত্ন

মেয়েদের মাসিক চলাকালে ব্যাথার সমাধান কি?

ডিম্বাণু জন্মের ঠিক আগে ঐ থলির মধ্যে থাকা হর্মোন উৎপাদনকারী কোষগুলি থেকে এস্ট্রোজেন ছাড়াও প্রোজেস্টেরোন নামক রস নিঃসৃত হয়। ডিম্বাণু বের হয়ে যাওয়ার পরে খালি থলিটিকে কর্পাস লু্যটিয়াম বলে। এই চক্র চলাকালীন কোন মহিলা গর্ভবতী হলে কর্পাস ল্যুটিয়াম থেকে উৎপাদিত কিছু হর্মোন সেই গর্ভকে স্থায়িত্ব দিতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থা না হলে কর্পাস ল্যুটিয়াম আবার শরীরে মিশে যায়।

শারিরীক মিলনের পর ইমার্জেন্সি পিল খাওয়ালে স্ত্রীর মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, করণীয় কি? পড়ুন বিস্তারিত

ডিম্বাণু জন্মের পরে নির্গত ডিম্বাণুটি একটি নলের (ফ্যালোপিয়ান টিউব) ছড়ানো শেষাংশে প্রবেশ করে তার কয়েকদিন ব্যাপী জরায়ু-মুখী যাত্রা শুরু করে। নলের ভেতরের পেশীগুলি ঢেউয়ের মত সংকোচন ও প্রসারণ করে ডিম্বাণুটিকে এই যাত্রায় সাহায্য করে। প্রত্যেকটি ডিম্বাণুবাহী নলের ভেতরের দেওয়ালে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রোম আছে যেগুলি ক্রমান্বয়ে ওঠানামা করে। যোনিপথে পুরুষ শুক্রাণু প্রবেশ করলে তা জরায়ু-গ্রীবা হয়ে জরায়ু পথে ডিম্বাণুবাহীনলে প্রবেশ করে। এই রোমরাজি শুক্রানুকে স্ত্রী গ্রন্থির দিকে ডিম্বাণুর কাছে ঠেলে দিতে সাহায্য করে।

পড়ুন  নিজের যৌবন সামলে রাখুন নইলে এদের দশাই হবে

গর্ভাধান ( মাসিক শুরু হলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন) হলে তা সাধারণত ডিম্বাণুবাহী নলের শেষের দিকে (স্ত্রী-গ্রন্থির কাছে) ডিম্বাণু জন্মের একদিনের মধ্যে হয়। একটি গর্ভাধান হওয়া ডিম্বাণু আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয়দিনের মধ্যে জরায়ুতে পৌঁছায়। ডিম্বাণুটির গর্ভাধান না হলে সেটি মাসিক বা ঋতুস্রাবের আগে যোনিপথে অন্যান্য ক্ষরণের সাথে বেরিয়ে যায়। এই নির্গমণ বোঝা যায় না। এই চক্র চলাকালে বিভিন্ন হর্মোনের প্রবহনে জরায়ু-গ্রীবায় উৎপাদিত শ্লেষ্মা ও তরল বেরিয়ে যাওয়ার একটি সাধারণ ধরণ আছে। তবুও নিজের ক্ষরণের ধরণ চেনা যায়। ডিম্বাণু জন্মের আগের অবস্থায় জরায়ু গ্রীবা থেকে ক্ষরিত তরলকে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের (মাইক্রোস্কোপ) তলায় দেখলে জট পাকানো তন্তুজালের মত লাগে। কিন্তু হর্মোনের প্রভাবে ডিম্বাণুর জন্মের সময় যত এগিয়ে আসবে ঐ ক্ষরণের গঠন বদলে গিয়ে অপেক্ষাকৃত লম্বা সরলরেখার মত বা ক্ষীণ সুতোর মত দেখতে তন্তু তৈরী হবে। এই সুতোই শুক্রাণুকে জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। অর্থাত্ এই তরলটি জরায়ুর দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করে। ডিম্বাণুর জন্মের সময়ে এই তরল মসৃণ ও ঘন হয়ে যোনির অভ্যন্তরীণ দেওয়ালে আবরণের সৃষ্টি করে এবং শুক্রাণুকে যোনির অম্ল-ক্ষরণ জনিত সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখে। শুক্রাণু জরায়ু-গ্রীবা নিসৃত উর্বর ক্ষরণের মধ্যে পাঁচদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ডিম্বাণু জন্মের পরে প্রোজেস্টেরন হর্মোনের সঙ্গে এস্ট্রোজেনের বিক্রিয়ার ফলে এই ক্ষরণ আরও ঘন হয় এবং ক্রমশ যোনিতে শুকিয়ে যায়।

ফেসবুক কমেন্ট

comments

About সাদিয়া প্রভা

সাদিয়া প্রভা , ইন্ডিয়ার Apex Group of Institutions এর BBA এর ছাত্রী ছিলাম। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বিয়সক তথ্য নিয়ে লেখালেখি করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.